
Md Masum Ahmed
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ৪:১৬ এএম

উত্তরবঙ্গের চিলাহাটি, ডোমার, ডিমলা ও এর বিভিন্ন জনপদের প্রাচীন ইতিহাস, কোচবিহার রাজবংশের সংযোগ এবং নামকরণের পেছনের লোকায়ত গল্পগুলোর একটি চমৎকার ও সুবিন্যস্ত সংকলন।
১৫০৯ খৃষ্টাব্দের আগে ভারতের কোচবিহার অঞ্চলটি ছিল কামরূপ রাজ্যের খণ্ডিত পশ্চিমাংশ। ইতিহাস মতে, গৌড়ের রাজা আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আক্রমণে কামরূপ ধ্বংস হলে কামরুপের বিভিন্ন উপজাতির মধ্যে তুমুল অরাজকতা সৃষ্টি হয়। এসময় সবচেয়ে শক্তিশালী উপজাতি 'কোচ'রা হাজো হাজং নামের একজনের নেতৃত্বে কামরুপের পশ্চিমাংশে কোচবিহার নামের এক নতুন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন।
হাজংসহ কোচবিহারে রাজত্ব করেন মোট ১৭ বা ১৮ জন রাজা। হীরা ও জিরা ছিলেন অপুত্রক হাজংয়ের দুই কন্যা। এর মধ্যে হীরার গর্ভজাত সন্তান বিশু বা বিশ্বসিংহ হন কোচবিহারের উত্তরাধিকারী। রাজবংশের দ্বিতীয় রাজা বিশুর মৃত্যুর পর তার পুত্র মল্লদেব বা নরনারায়ণ তার বৃহদায়তন রাজ্যের পশ্চিম অংশকে মুঘল আগ্রাসন থেকে রক্ষায় বোদা চাকলা অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য পাঠান তারই ছোট ভাই শুল্কধ্বজ ওরফে চিলা রায়কে। ঠিক যে স্থানে চিলা রায়কে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে হয়েছিল, তারই নামকরণ করা হয় 'চিলাহাটি'।
তৎকালে কোচবিহার রাজ্যের শেষ পরগনা বোদা চাকলা তেঁতুলিয়া থেকে পঞ্চগড়, দেবীগঞ্জসহ ডোমার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বোদা চাকলায় রাজ প্রতিনিধি হিসেবে ছোট ভাই চিলা রায়কে স্থাপন করে মহারাজ নরনারায়ণ এক সময় রাজ্য পরিদর্শনে বের হন। এসময় তিনি মেকলিগঞ্জ পরগনায় পৌঁছে তার এক ক্ষুদ্র সামন্ত বসন্তরঞ্জন রায়ের বাড়িতে এক রাতের জন্য আতিথ্য গ্রহণ করেন। বিদায়ের সময় বসন্তরঞ্জন তার কন্যা হেমকুমারী দেবীর হাতে স্থানীয়ভাবে তৈরি এক তসরের চাদার রাজাকে উপহার দেন। এসময় সামন্ত কন্যাকে দেখে রাজা চমৎকৃত হন এবং তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। রাজার প্রস্তাবে বসন্তরঞ্জন অভিভূত হয়ে তৎক্ষণাৎ বিয়ের তারিখ প্রার্থনা করেন। মহারাজা কিছুদিন পর একটি তারিখ নির্ধারণ করেন এবং হেমকুমারী দেবীর সৌজন্যে বসন্তরঞ্জনের অধীনে এক বিশাল মৌজার নামকরণ করেন 'হেমকুমারী'।
এদিকে মহারাজ নরনারায়ণের তরফ থেকে ঘটানো হয় নববধূকে বরণ, এবং রাজধানীতে তাকে নিয়ে যাবার আগেই চিলা রায় রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের বেশ কিছু সৈন্য ও রাজ কর্মচারীসহ এসে পড়ে হেমকুমারী দেবীকে নেওয়ার জন্য। তিনি নববধূকে রাজার কাছে না নিয়ে বোদা চাকলায় নিজ আস্তানায় নেন এবং সেখানে তাকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন। এতে মহারাজ নরনারায়ণ অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে চিলা রায়কে শাস্তি দেওয়ার কথা চিন্তা করেন।
এদিকে চিলা রায় নিজেও জানতেন যে তার কার্যকলাপে মহারাজ তার উপর চরম ক্ষিপ্ত হবেন। তাই তিনি তিস্তা নদীর পশ্চিম তীরের ঘন জঙ্গলে গোপন একটি সেনানিবাস গড়ে তোলেন এবং একটি ছোটখাটো সেনানিবাস তৈরি করেন। এসময় নরনারায়ণ রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও সীমান্তে অন্য রাজ্যের হামলার আশঙ্কা করে চিলা রায়কে শাস্তি দেবার পরিকল্পনা বাতিল করেন। চিলা রায় রাজা উপাধি গ্রহণ করে নিজ রাজ্যসীমা পশ্চিম ও দক্ষিণে বাড়ানোর চেষ্টা করেন। সে জন্য তিনি (১৫৬৩–১৫৭২) গৌড় রাজ্যের অংশবিশেষ দখলের জন্য যুদ্ধ চালান। ১৫৭২ খৃষ্টাব্দের শেষের দিকে সুলেমান কররানীর দক্ষ সেনাপতি কালাপাহাড়ের সাথে যুদ্ধ করার জন্য দক্ষিণে অগ্রসর হতে থাকেন। পথিমধ্যে বসন্ত রোগাক্রান্ত হয়ে গঙ্গা নামক স্থানে তিনি মারা যান।
চিলা রায়ের কোনো সন্তান সন্ততি ছিল কিনা জানা যায়নি। জনশ্রুতি আছে, হেমকুমারী দেবীর গর্ভজাত এক পুত্র সন্তান তার ছিল, যে পরে পিতৃশোকে পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। স্থানীয় লোকজন তাকে 'ভাউলা পাগলা' বলে ডাকতো। আর সেই ভাউলা পাগলের নামের সাথে আজকের চিলাহাটি ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত 'ভাউলাগঞ্জ' এলাকার নামকরণের কোনো যোগসূত্র থাকলেও থাকতে পারে।
চিলাহাটি ইউনিয়ন বর্তমানে পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ এবং চিলাহাটি রেলস্টেশন নীলফামারীর ডোমার উপজেলার নিজ ভোগডাবুড়ি ইউনিয়নে পড়ে। উভয় চিলাহাটির মানুষই এই নামে গর্ববোধ করে।
তথ্যসুত্রেঃ আব্দুল কাদের স্যার
কোচবিহার (Cooch Behar) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলা এবং ঐতিহাসিকভাবে একটি রাজ্য ছিল, যা তার রাজকীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির জন্য পরিচিত, আর চিলাহাটি (Chilahati) মূলত বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ রেল স্টেশন ও সীমান্ত এলাকা, যা ঐতিহাসিকভাবে কোচবিহারের খুব কাছাকাছি অবস্থিত ছিল; দুটি স্থানই উত্তরবঙ্গ ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলের অংশ এবং ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত ছিল, বিশেষত রেল যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক কারণে, যদিও বর্তমানে তারা ভারত ও বাংলাদেশের দুটি ভিন্ন প্রশাসনিক অঞ্চলের অন্তর্গত।
কোচবিহারের মেখলিগঞ্জ মহকুমার অধীনে চিলাহাটি গ্রামেবিখ্যাত হুজুর সাহেবের দরগা অবস্থিত, যেখানে প্রতি বছর বড় মেলা বসে এবং বাংলাদেশ থেকেও অনেকে আসেন। [সোর্সঃ গুগল]
ডোবা অর্থ নিচু জলাশয়। কোথাও ডোবাকে ডাবুড়ী বলা হয়। ডোমারের চিলাহাটি থেকে ৩ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এই রকম একটি ডাবুড়ী আছে। সবসময় জলমগ্ন থাকে। কোন ফসল উৎপন্ন হয় না। অতীতে পাশের হিন্দু প্রধান এলাকা থেকে লোকজন এখানে মানত করত। ঈশ্বরের কৃপা লাভের আশায় বছরের বিভিন্ন সময় ডাবুড়ীর তীরে এসে প্রাচীন গাছের গোড়ায় ফলমূল দিয়ে ভোগ দিত। পূজার ভোগ এর সঙ্গে ডাবুড়ী সংযুক্ত হয়ে এলাকার নামকরণ হয়েছে ভোগডাবুড়ী। এই নামকরণ কখন হয়েছে তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে এটি ব্রিটিশ আমলের শুরুতে হয়েছে বলে এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিরা মনে করেন।
ভোগডাবুড়ী সীমান্তবর্তী এলাকা। এটি সুজলা সুফলা। সব ধরনের ফসল উৎপন্ন হয়। ভোগডাবুড়ীর আয়তন ৯০৪৭ একর। জনসংখ্যা ৩৬৮২৫ জন।
খানকা ফার্সি শব্দ যার অর্থ হলো সুফি সাধকদের আস্তানা, ইবাদতখানা বা আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্র। এটি সাধারণত এমন একটি ভবন বা চত্বরকে বোঝায় যেখানে কোনো পীর, সুফি বা দরবেশ তাঁর মুরিদ ও অনুসারীদের নিয়ে অবস্থান করেন এবং সেখানে জিকির, আধ্যাত্মিক আলোচনা ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করা হয়। ইউনুস হাশেমি (রহঃ) ১৯৭৪ সালে এখানে এসে ইসলামের শিক্ষা/ দাওয়াত দিয়েছিলেন।
পূর্বে বউ বাজার এর নাম ছিল ফুলবাড়ি। হলদি বাড়ির পীর ইউনুস হাশেমি (রহঃ) এর খলিফা খানকায় থেকে ইসলামের শিক্ষা/ দাওয়াত দিতেন। উনি যখন খানকায় ছিলেন তখন সেখানে ধু ধু বালু আর একটি ঘর। বর্তমান রেজিস্ট্রি অফিস সংলগ্ন পাকা রাস্তায় ঐ সময়ে জঙ্গল ছিল। পাশাপাশি ফুলের গাছও ছিল। মানুষ এই অঞ্চল এর নাম বলতো ফুলবাড়ি। আশির দশকে এই অঞ্চল এ যখন খানকা শারিফ প্রতিষ্ঠা হলো তখন মানুষের যাতায়াত শুরু হলো। তখন তিন জন বউ এখানে তিনটি দোকান স্থাপন করে। তিনটি দোকানে তিনজন বউ বসতো। কথিত আছে তিন জন বউ এর মধ্যে কেও ভাপা পিঠা , কেও পান বিক্রি করতো । স্বামী অসুস্থ থাকায় বউরা দোকানে বেশি বসতো। বউ থেকেই মুলত বউ বাজার নামকরন করা হয়। পরবর্তীতে এখানে পুলিশ তদন্ত ফাঁড়ী স্থাপন হলে এটি থানা বাজার হিসেবে পরিচিতি পায়। অর্থাৎ বউ বাজার পূর্বে ফুলবাড়ি নামে পরিচিত ছিল, তারপর বউ বাজার নাম হলো, যা এখন থানা বাজার নামেও পরিচিত।
জমিদারি আমলে কর সংগ্রহের বৃহৎ অঞ্চলকে বলা হতো চাকলা এবং ক্ষুদ্র অঞ্চলকে বলা হতো কাওলা।
১৯৭০ এর দশকে এখানে হিন্দু ধর্মের গোসাই এর বসবাস ছিল। এই গোসাই থেকেই গোসাইগঞ্জ।
শব্দিগঞ্জ নামের উৎপত্তি মূলত একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম থেকে। ব্রিটিশ আমলে 'শব্দি' নামে একজন ব্যক্তি এই এলাকায় বসবাস করতেন। তার নামানুসারেই এই অঞ্চলের নামকরণ করা হয় 'শব্দিগঞ্জ'। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, ব্রিটিশ আমল থেকেই এই নামটির প্রচলন রয়েছে। এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিরা বংশপরম্পরায় এই একই ইতিহাস জেনে আসছেন।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও ব্যবসা-বাণিজ্য
ব্রিটিশ শাসনামলে শব্দিগঞ্জ একটি গুরুত্বপূর্ণ 'বন্দর' বা বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত ছিল।
নৌপথ: তৎকালীন সময়ে পণ্য আনা-নেওয়ার প্রধান মাধ্যম ছিল নদীপথ। বুড়িতিস্তা নদী ব্যবহার করে এই বন্দরে বিভিন্ন মালামাল আদান-প্রদান করা হতো।
বর্তমান অবস্থা: কালের বিবর্তনে নদী শুকিয়ে যাওয়ায় এবং পানির নাব্যতা কমে যাওয়ায় বর্তমানে সেই নৌপথ বা বন্দরের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে।
উল্লেখযোগ্য স্থাপনা:
শব্দিগঞ্জ নামের সাথে জড়িত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এই এলাকায় রয়েছে:
শব্দিগঞ্জ ঈদগাহ ময়দান: এটি এলাকার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থাপনা। ধারণা করা হয়, এটি ১৭১২ সালের দিকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একসময় এই ঈদগাহটি এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে ভারতের হলদিবাড়ী, সিংঝাড়হাট এবং কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও ধর্মপ্রাণ মানুষ এখানে ঈদের নামাজ পড়তে আসতেন। সীমান্ত কাঁটাতারের বেড়া হওয়ার পরও অনেককে এখানে নামাজ পড়তে আসতে দেখা যেত।
অন্যান্য: এছাড়াও এই ব্যক্তির নামে শব্দিগঞ্জ ফরেস্ট (বন) গড়ে উঠেছে।
বি ও পি বাজার পার হয়ে জাগরণ চা বাগান এর পাশে গিরিয়ার ডাঙ্গা অবস্থিত। গিরিয়ার ডাঙ্গা নামকরণের সাথে গিরিয়ার যুদ্ধ জড়িত। জনশ্রুতি আছে গিরিয়ার যুদ্ধের একটি অংশ এখানে সংগঠিত হওয়ায় এটি গিরিয়ার ডাঙ্গা নামকরণ হয়।
নোটঃ
গিরিয়ার প্রথম যুদ্ধ ১৭৪০ সালের ৯ এপ্রিল বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদের গিরিয়ায় বাংলার নবাব সরফরাজ খান এবং বাংলার অধীনস্থ বিহারের নায়েব নাযিম আলীবর্দী খানের মধ্যে সংঘটিত হয়। যুদ্ধে সরফরাজ খান পরাজিত ও নিহত হন[১][২] এবং আলীবর্দী খান বাংলার মসনদে অধিষ্ঠিত হন।
কেতকীবাড়ী একটি সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন। ডোমার থেকে প্রায় ৩৫/৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। নামকরণ বিষয়ে এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায় যে, অনেক আগে এলাকায় যত্রতত্র প্রচুর পরিমাণে কেতকী ফুল জন্মাতো। এর অপর নাম কেয়া ফুল। আকারে ছোট হলেও দেখতে খুব সুন্দর, লাল টকটকে। তবে ঘাসের সঙ্গে এই ফুল মিশে থাকতো। শীতের সময় কেতকী ফুল বেশী ফুটতো। গ্রামের পর গ্রাম কেতকী ফুলের সৌন্দর্যে আলোকিত হতো। তাই ইউনিয়নের নাম হয়েছে কেতকীবাড়ী।
কেতকীবাড়ীতে ১৯৭১ সালে জুন মাসে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর এক ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে বেশ কিছু পাকিস্তান আর্মি নিহত হয়। যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা জিএম রাজ্জাক, রওশন, শহীদুল, আলম অসম সাহসের পরিচয় দেন। মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র আক্রমণের মুখে পাকিস্তান আর্মি কেতকীবাড়ী ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায়। কেতকীবাড়ী ইউনিয়নের এলাকাটি উঁচু। এখানে প্রচুর পরিমাণে রবিশস্য উৎপন্ন হয়। ইউনিয়নের আয়তন ৪৬৯৫ একর। লোকসংখ্যা ১৭৮৮৩ জন।
জমিদার ঘুনুরাম এর নাম অনুসারে ঘুনুরাম স্কুল এর নাম করা হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় তিনি ভারতের আলিপুরদুয়ারে চলে যান।
রাজা ভীম এর শাসনামলে (১০৭৫-১০৮২ খ্রিষ্টাব্দ) এই অঞ্চলটি পশুপালনের জন্য বিখ্যাত ছিল। কথিত আছে, এখানে রাজার বিশাল গোশালা বা গরুর খামার ছিল।স্থানীয় লো৩ককথা অনুযায়ী, রাজা ভীম পাল তাঁর প্রিয় নাতিকে এই বিশাল গোশালাটি উপহার দিয়েছিলেন। রাজপরিবারের নাতির তত্ত্বাবধানে এই গরু বা 'গো' পালিত হতো বলে এলাকাটি পরিচিতি পায় 'গো-মন-নাতি' (অর্থাৎ রাজার নাতির মনের মতো গোশালা) হিসেবে, যা কালক্রমে সংক্ষেপে 'গোমনাতি' হয়ে দাঁড়ায়।
কথিত আছে, কোনো একজন কে খুন করে গুম করা হয়। এই গুম থেকেই মুলত গোমনাতি নামটি এসেছে। তথ্যসুত্রেঃ হাবিব স্যার (প্রিন্সিপাল, আমবাড়ি কিন্ডারগার্টেন)
গোমনাতির নাম অনুসন্ধানে জানা যায় যে, এখানে একজন প্রভাবশালী জমিদার ছিলেন। তাঁর নাম গোবিন্দ নাথ ওরফে গোমনাথ। গোমনাথের নাম অনুসারে এলাকার নাম হয়েছে গোমনাতি। কিছু ব্যক্তির মতে গোমনাতি এলাকায় এক সময় প্রচুর গো অর্থাৎ গবাদি পশু পালন করা হতো। গরু-মহিষ মাঠে চরানো হতো। এতে এলাকায় সারাবছর গোনাদি অর্থাৎ গোবর পড়ে থাকতে দেখা যেত। গোনাদি থেকে গোমনাতি শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। আরেকটি সূত্র মতে, এখানে একটি বড় নদী ছিল সেখানে মাঝে মধ্যে নৌকা ডুবি তথা গুম হতো। গুমহতি থাকে, থেকে গোমনাতি শব্দের উৎপত্তি হয়েছে বলে অনুমিত হয়। তবে গোবিন্দ নাথের নামে গোমনাতি হয়েছে তা সহজে বুঝা যায়।কেননা গোবিন্দনাথ জমিদারের জমিদারি সম্পর্কে সুস্পষ্ট প্রমাণ আছে। গোবিন্দনাথের মৃত্যুর বহুকাল পরেও তার বাড়ির চিহ্ন বহাল ছিল বলে জানা যায়। গোমনাতি নিচু এলাকা হলেও প্রচুর খাদ্য-শস্য জন্মে। এর মধ্যে ধান, পাট, গম, ভুট্টা প্রধান। গোমনাতি অতীতকাল থেকেই মৎস্যের জন্য বিখ্যাত। এখানকার বিল ঝিলে ডোবায় এখনও প্রচুর পরিমাণে মাছ পাওয়া যায়। এলাকার মানুষ আর্থিকভাবে স্বচ্ছল এবং তারা মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। গোমনাতির আয়তন ৭০৫৪ একর। লোকসংখ্যা ২৫৪২০ জন।
১। ডোমার নামের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হলো “ডোম + আরা” থেকে।প্রাচীনকালে এখানে বসত করত ডোম জনগোষ্ঠী, যারা বাঁশ ও কাঠের শিল্প, মৃতদেহ দাহ এবং কুটিরশিল্পে নিযুক্ত ছিল।তাদের বসতি বা “ডোমদের আরা” ধীরে ধীরে উচ্চারণ পরিবর্তনের মাধ্যমে ডোমার হয়ে যায়।
২ ডোমননগর: ঐতিহাসিকদের মতে, বর্তমান ডোমার ছিল রাজা ভীমের(১০৭৫-১০৮২ খ্রিষ্টাব্দ) সামরিক কেন্দ্র বা 'ডোমন নগর'। তিনি সমাজে অবহেলিত ডোম(যারা বাঁশ ও কাঠের শিল্প, মৃতদেহ দাহ এবং কুটির শিল্পে নিয়োজিত) ও নিম্নবর্ণের মানুষদের নিয়ে একটি শক্তিশালী গেরিলা বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। তার পদাতিক বাহিনীতে নিম্নবর্ণের 'ডোম' যোদ্ধাদের আধিক্য থাকায় এই নামকরণ । তাদের রণসজ্জার স্মৃতি থেকেই উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতিতে "আগাডুম বাগাডুম" ছড়াটির জন্ম। আগডুম অর্থে অগ্রবর্তী ডোম সৈন্য বাহিনী, বাগডুম অর্থে বাঘের ন্যায় তেজোবীর্যবান ডোমবাহিনী এবং ঘোড়াডুম অর্থে অশ্বারোহী ডোমবাহিনীর কথা বলা হয়েছে। আর রণবাদ্যের উপকরণ ছিল ঢাক, মৃদঙ্গ, ঝাঝর ইত্যাদি।
নীলফামারী জেলা শহরের সোজা উত্তর দিকে প্রায় ২২ কিলো দূরে ডোমার উপজেলা অবস্থিত। এটি একটি ঐতিহ্যবাহী উপজেলা। বিভিন্ন আমলে বিশেষতঃ পাল আমল থেকে এই উপজেলার খ্যাতি ছিল।
৩। প্রাচীন ডোমারের নামকরণ ঐতিহ্যময়। এখানে দ্বিতীয় মহীপালকে পরাজিত করে কৈবর্ত রাজ উত্তরবঙ্গ অধিকার করেন এবং ডোমারে রাজধানী স্থাপন করেন। ডোমারের প্রাচীন নাম ছিল ডোম নগর। সেখান থেকে ডোমারের নাম হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। আবার অনেকে মনে করেন প্রাচীনকালে ডোম নামক এক সাহসী জাতি এখানে বাস করতো। তাদের আদি পেশা ছিল কৃষি। তবে তারা সেনাবাহিনীতে যোগ দিত। দিব্যোকের সেনাবাহিনীতে ডোম জাতির আধিক্য ছিল। তাদের সাহস ও বীরত্বের জন্য এলাকার নাম হয়েছে ডোম নগর। পরবর্তীতে তা লোকমুখে দাঁড়ায় ডোমার হিসাবে। উপজেলায় ৯৬% মুসলিম এবং ৪% হিন্দু বাস করে। জনসংখ্যা ঘনত্ব ৮৩৫ জন।
ডোমারের আয়তন ২৫০.৮৬ কিলোমিটার। লোকসংখ্যা ২৪৫২৫০ জন। পৌরসভার আয়তন ১২০৮.৯৭ একর। ৯টি ইউনিয়ন নিয়ে ডোমার উপজেলা গঠিত। ইউনিয়নগুলো হচ্ছে সোনারায়, বোড়াগাড়ী, হরিণচড়া, বামুনিয়া, কেতকীবাড়ী, পাঙ্গা মটুকপুর, ভোগডাবুড়ী, জোড়াবাড়ী ও গোমনাতী।
নীল এবং ফার্মার শব্দ দুটির সমন্বিত রূপ নীলফার্মার এবং সেখান থেকে উচ্চারণ বিবর্তনে নীলফামারী নামের উৎপত্তি হয়েছে। অতএব নীলফামারী শব্দটিকে নীলখামারী শব্দের অপভ্রংশ মনে না করে বরং প্রায় অবিকল নীলফার্মারীর সহজ উচ্চারণিক শব্দ সংক্ষেপ বলে গ্রহণ করাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত।
নীলফামারী জেলা পূর্বে রংপুর জেলার একটি মহকুমা ছিল। যদিও প্রথমে সৈয়দপুরকেই এই মহকুমা করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু সৈয়দপুরের তুলনায় নীলফামারীতে সুপেয় জল লাভ করা সহজ বিবেচনা করে তৎকালীন সিভিল সার্জন কে.ডি ঘোষাল সৈয়দপুরের পরিবর্তে নীলফামারীকেই মহকুমা সদর করা অধিকতর যুক্তিসঙ্গত বিবেচনা করেন। অতঃপর ১৮৭৫ সালে নীলফামারীতে মহকুমা সদর স্থাপন করা হয়। ১৯৭২ সালে মহকুমা সদরকে পৌরসভায় উন্নীত করা হয়। ১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নীলফামারী মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা হয়। সর্বশেষ সদর উপজেলাসহ ডিমলা, ডোমার, জলঢাকা, কিশোরগঞ্জ ও সৈয়দপুর উপজেলা নিয়ে নীলফামারী জেলা গঠিত হয়েছে। ডিমলা উপজেলার আয়তন ৩২৬.৮০ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা প্রায় ২১৮১০০ জন। এখানে থানা সদর প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫৭ সালে। জানা যায়, ষোলো শতকের দিকে ‘মোহাম্মদ কলিমুল্লাহ নামক একজন প্রভাবশালী জমিদার ছিলেন। তার নামানুসারে এই এলাকার নাম হয় ‘মোহাম্মদগঞ্জ’। ১৮৮০ সালে ভারতের বর্ধমান জেলার দশঘোড়া অঞ্চলের জমিদার এই এলাকাটি নিলামে কিনে নেন। তিনি এখানে ডিম্বাকৃতির একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে এই ডিম্বাকৃতির প্রাসাদের জন্য এই এলাকাটি সাধারণ লোকজনের কাছে ডিমলা নামে পরিচিতি লাভ করে। আবার নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাতাত্ত্বিক মতানুসারে প্রাক চর্যার যুগে উত্তরবঙ্গে ডিমাসা, রাভা, মোরাঙ্গ প্রভৃতি ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর লোক এখানে বসবাস করতো। এই ডিমাসা জাতির বসবাস থেকে ডিমলা নামকরণ হয়েছে এমন মতবাদও প্রচলিত আছে। ডোমার উপজেলার আয়তন ২৫০.৮৪ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা প্রায় ২১৬৫৪০ জন। এখানে থানা সদর প্রতিষ্ঠার সঠিক সন তারিখ পাওয়া যায় নি। ডোমার অঞ্চলের পূর্ব নাম ছিল ডোমন নগর। জানা যায় কৈবর্ত্য জাতির রাজত্ব কালে (১০৭১ সালে) ভীম এর রাজধানী ছিল ডোমন নগর। ধারণা করা হয় ডোমন নগর পরিবর্তিত হয়ে ডোমার হয়েছে। আবার বলা হয়ে থাকে, ডোম জাতি গোষ্ঠীর লোকেরা এখানে বসবাস করতো বলে এ অঞ্চলের নাম হয়েছে ডোমার। ডোমেরা সাধারণত বাঁশ দিয়ে জনসাধারণের নিত্যব্যবহার্য বিভিন্ন উপকরণ যেমন : ডালি, কুলা, চালুন, খাঁচা ইত্যাদি তৈরি করতো। অনেকে মনে করেন কৈবর্তদের শাসনামলে উত্তরবঙ্গে ডোম সৈন্যদের প্রাধান্য ছিল। সে সময় তারা সমাজে সম্মানজনক অবস্থানে থেকে সচ্ছল জীবনযাপন করতো। মধ্যযুগের সেই ডোম সম্প্রদায়ের আধিপত্য থেকে ডোম নগর নামকরণ হয়েছে। পূর্ববর্তী ডোম নগরের পরিবর্তিত ও সংক্ষিপ্ত নামই আজকের ডোমার।